জীবনযাপন

জন্মাষ্টমী ও এর শোভাযাত্রার ইতিহাস : অঞ্জন আচার্য

জন্মাষ্টমীর আবির্ভাব : হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রাচীন ধর্মীয় উৎসব জন্মাষ্টমী বা কৃষ্ণজন্মাষ্টমী। এটি পালিত হয় বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণের জন্মদিন হিসেবে। এর অপর নাম কৃষ্ণাষ্টমী, গোকুলাষ্টমী, অষ্টমী রোহিণী, শ্রীকৃষ্ণজয়ন্তী।

হিন্দু পঞ্জিকা মতে, সৌর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে যখন রোহিণী নক্ষত্রের প্রাধান্য হয়, তখন পালিত হয় এ জন্মাষ্টমী। উৎসবটি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে, প্রতি বছর মধ্য আগস্ট থেকে মধ্য সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোনো একসময়ে পড়ে। শাস্ত্রীয় বিবরণ ও জ্যোতিষ গণনার ভিত্তিতে লোকবিশ্বাস অনুযায়ী কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল ৩২২৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ১৮ কিংবা ২১ জুলাই, মথুরা নগরীতে অত্যাচারী রাজা কংসের কারাগারে। বসুদেব ও দেবকীর অষ্টম পুত্র তিনি। তার পিতামাতা উভয়েই যাদববংশীয়। দেবকীর দাদা কংস, তাদের পিতা উগ্রসেনকে বন্দি করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। একটি দৈববাণীর মাধ্যমে কংস জানতে পারেন যে, দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের হাতে মৃত্যু হবে তার। এই কথা শুনে দেবকী ও বসুদেবকে কারারুদ্ধ করেন তিনি এবং তাদের প্রথম ছয় পুত্রকে হত্যা করেন। দেবকী তার সপ্তম গর্ভ রোহিণীকে প্রদান করলে জন্ম হয় বলরামের। এরপরই জন্মগ্রহণ করেন কৃষ্ণ। কৃষ্ণের জীবন বিপন্ন জেনে জন্মরাত্রেই দৈবসহায়তায় কারাগার থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে বসুদেব তাকে গোকুলে তার পালক মাতা-পিতা যশোদা ও নন্দের কাছে রেখে আসেন। কৃষ্ণ ছাড়া বসুদেবের আরো দুই সন্তানের প্রাণরক্ষা হয়েছিল। প্রথমজন বলরাম (যিনি বসুদেবের প্রথম স্ত্রী রোহিণীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন) এবং সুভদ্রা (বসুদেব ও রোহিণীর কন্যা, যিনি বলরাম ও কৃষ্ণের অনেক পরে জন্মগ্রহণ করেন)।

শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গে : সমগ্র ভারতবর্ষে যখন হানাহানি, রক্তপাত, সংঘর্ষ, রাজ্যলোভে রাজন্যবর্গের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ তথা পৃথিবী যখন মর্মাহত, পাশে অবনত, ঠিক সেই সৃষ্টি স্থিতি-প্রলয়ের যুগ সন্ধিক্ষণে অনিবার্য হয়ে পড়ে কৃষ্ণের আবির্ভাব। ঘোর অমানিশার অন্ধকারে জন্মগ্রহণ করায় কৃষ্ণের গায়ের রং শ্যামল, অন্য অর্থে ধূসর, পীত, কিংবা কালো। সংস্কৃত ‘কৃষ্ণ’ শব্দটির অর্থ কালো, ঘন বা ঘন-নীল। কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কৃষ্ণের মূর্তিগুলোতে তার গায়ের রং সাধারণত কালো এবং ছবিগুলোতে নীল দেখানো হয়ে থাকে। তার রেশমি ধুতিটি সাধারণত হলুদ রঙের এবং মাথার মুকুটে একটি ময়ূরপুচ্ছ শোভা পায়। কৃষ্ণের প্রচলিত মূর্তিগুলোতে সাধারণত তাকে দেখা যায় বংশীবাদনরত এক বালক বা যুবকের বেশে। এ দৃশ্যে তার একটি পা অপর পায়ের ওপর ঈষৎ বঙ্কিম অবস্থায় থাকে এবং বাঁশিটি ওঠানো থাকে তার ঠোঁট পর্যন্ত। তাকে ঘিরে থাকে গোরুর দল; এটি তার দিব্য গোপালক সত্ত্বার প্রতীক। কোনো কোনো চিত্রে তাকে গোপী-পরিবৃত অবস্থাতেও দেখা যায়।

জন্মাষ্টমীতে শোভাযাত্রা : বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী উৎসব জন্মাষ্টমী। এ উৎসবে অংশ নিতেন স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। শুধু তাই নয়, একসময় ঢাকা শহরে জন্মাষ্টমীর যে শোভাযাত্রা বের হতো তা সারা উপমহাদেশে ছিল খ্যাত। শ্রাবণ বা ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে শ্রীকৃষ্ণ জন্ম তিথিটি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এক পুণ্যের দিন। এদিন শ্রীকৃষ্ণ পাপ দমন ও ধর্মসংস্থাপনের জন্য দেবকী বাসুদেবের পুত্ররূপে কংসের কারাগারে জন্মগ্রহণ করেন। সে তো আগেই উল্লেখ করেছি। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করে, এ দিনে শুধু উপাবাসেও সাত জন্মের পাপ মোচন হয়। আর তাই এ দিনটিতে তারা উপবাস করে লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা করেন। এর সঙ্গে সঙ্গে কালের স্রোতে ধীরে ধীরে যুক্ত হয় র‌্যালি বা শোভাযাত্রা। ক্রমেই জন্মাষ্টমী পালনের প্রধান অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায় এ শোভাযাত্রা। একসময় এ জন্মাষ্টমী উৎসব অথবা জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন ঢাকাবাসী। বর্তমানে এর ছোঁয়া থাকলেও আগের সেই জৌলুস আর নেই। কিন্তু ঠিক কবে থেকে এবং কেন জন্মাষ্টমী উৎসবে শোভাযাত্রা শুরু তার নির্দিষ্ট কোনো ইতিহাস জানা যায়নি। শোভাযাত্রার পুরনো ইতিহাস লেখক ভুবন মোহন বসাক এবং যদুনাথ বসাকের দুটি বইয়ের তথ্যানুসারে জন্মাষ্টমী উৎসবে শোভাযাত্রার শুরু হয়েছিল ষোড়শ শতকে। ভুবন মোহনের লেখা বই অনুসারে ইসলাম খাঁর ঢাকা নগরের পত্তনের (১৬১০ সাল) আগে বংশালের কাছে বাস করতেন এক সাধু। ১৫৫৫ সালে (ভাদ্র ৯৬২ বাংলা) তিনি শ্রীশ্রী রাধাষ্টমী উপলক্ষে বালক ও ভক্তদের হলুদ পোশাক পরিয়ে একটি র‌্যালি বের করেছিলেন। এর প্রায় ১০-১২ বছর পর সেই সাধু ও বালকদের উৎসাহে রাধাষ্টমীর কীর্তনের পরিবর্তে শ্রীকৃষ্ণের জন্মোপলক্ষে জন্মাষ্টমীর অপেক্ষাকৃত জাঁকজমকপূর্ণ একটি শোভাযাত্রা বের করার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। সে উদ্যোগেই ১৫৬৫ সালে বের হয় প্রথম জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা। পরবর্তীকালে এ মিছিলের দায়ভার এসে বর্তায় ঢাকার নবাবপুরের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী কৃষ্ণদাস বসাকের পরিবারের ওপর। কালক্রমে জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা একটি সাংগঠনিক রূপ ধারণ করে এবং প্রতি বছর জন্মাষ্টমী উৎসবের নিয়মিত অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। ১০৪৫ বঙ্গাব্দে কৃষ্ণদাসের মৃত্যুর পর থেকে শ্রীশ্রী লক্ষ্মীনারায়ণ চক্রই এ উৎসবের আয়োজন শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রাকে উন্নত করে তোলেন। এরপর থেকে নবাবপুরের ধনাঢ্য ব্যক্তিরাও জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বের করতে শুরু করে নিজ নিজ শোভাযাত্রা। কালক্রমে যা পরিচিত হয় ওঠে ‘নবাবপুরের মিছিল’ নামে। অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে ইসলামপুরের পান্নিটোলার কিছু ব্যবসায়ী ধনাঢ্য হয়ে ওঠে এবং কৃষ্ণের অনুসরণে তারা বের করতে শুরু করেন জন্মাষ্টমীর র‌্যালি।

১৭২৫ সালে জেমস টেলর উল্লেখ করেন, ওই সময় জন্মাষ্টমী পালনের জন্য দুটি পক্ষের সৃষ্টি হয়। নবাবপুর পক্ষকে বলা হতো, লক্ষ্মীনারায়ণের দল আর ইসলামপুর পক্ষকে বলা হতো, মুরারি মোহনের দল। সপ্তদশ শতকে শোভাযাত্রার শুরু হলেও তা বিকশিত হয়েছিল মূলত উনিশ শতকের শেষার্ধে, যে ধারা বলবৎ ছিল বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত। প্রথম দিকে র‌্যালিতে নন্দঘোষ, রানী যশোদা, শ্রীকৃষ্ণ ও বলরামকে আনা হতো। ক্রমেই এর সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে আরো নানা ধরনের অনুষঙ্গ। তবে মূল কাঠামোটি ছিল প্রথমে নেচে-গেয়ে যাবে কিছু লোক, এরপর দেব-দেবীর মূর্তি, লাঠিসোঁটা, বর্শা, নিশান প্রভৃতি নিয়ে বিচিত্র পোশাক পরিহিত মানুষ, নানা রকমের দৃশ্য। শোভাযাত্রার প্রধান আকর্ষণগুলো ছিল সুসজ্জিত হাতি, ঘোড়া, রঙিন কাগজে মোড়ানো বাঁশের টাট্টি, প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড মন্দির, মঠ, প্রাসাদ ও প্রাচীন কীর্তির প্রদর্শন। সেসব আয়োজন এখন শুধুই স্মৃতি। কিন্তু হাজার প্রতিকূলতার পরও ঢাকায় এখনো জন্মাষ্টমী উৎসব ও শোভাযাত্রা জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়।

জন্মাষ্টমীর উপপাদ : শ্রীকৃষ্ণের জীবনী পাঠ ও কর্মকাণ্ড মানবসমাজকে শিক্ষা দেয়, সৌভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বন্ধনে বিশ্ব-সমাজকে আবদ্ধ করার ক্ষেত্রে কৃষ্ণের দর্শন ও প্রেমের বাণী রাখতে পারে কার্যকরী ভূমিকা। তাইতো শুধু দুষ্টের দমনই নয়; এক শান্তিময় বিশ্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতি বছর শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন তথা জন্মাষ্টমী আমাদের মাঝে নিয়ে আসে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে এক শুভ আনন্দময় বার্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *